বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২৬, ১১:৪৯ অপরাহ্ন

বিজ্ঞাপন:
আমাদের ওয়েব সাইটে আপনাকে স্বাগতম...
শিরোনাম :
দক্ষিণ সুরমার চিহ্নিত অপরাধ স্পটগুলোতে যুবসমাজ ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের কঠোর হুঁশিয়ারি প্রযুক্তির ছোঁয়ায় বদলে গেছে বন্ধুত্ব, মোবাইল গেমেই আসক্তি রূপগঞ্জে সড়ক দুর্ঘটনায় নরসিংদী সরকারি কলেজের ছাত্র মুয়াজ নিহত ঘুষ ছাড়া ফাইল নড়ে না সিসিক প্রশাসকের সিএ ফয়জুরের বিরুদ্ধে অভিযোগ, নেপথ্যে প্রকৌশলী রাজিউদ্দিন নাগেশ্বরীতে টানা লোডশেডিং, জনজীবন বিপর্যস্ত সিলেটের রায়নগরে ট্রিপল মার্ডারের রহস্য উন্মোচনের পথে, মূল হোতা গৃহপরিচারিকার কথিত প্রেমিক ভূরুঙ্গামারীতে জমি নিয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, কোঁচের আঘাতে যুবক নিহত; দেশীয় অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার ১৭ রূপগঞ্জে শীতলক্ষ্যায় ট্রলারে পুলিশের অভিযান, ইউপি সদস্যসহ আটক ২০ রূপগঞ্জে সাহাপুর-মুশরী-তেলিপাড়া খাল সংস্কার কাজের উদ্বোধন নাগেশ্বরীতে মেধা বৃত্তি ও কৃতি শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠান

প্রযুক্তির ছোঁয়ায় বদলে গেছে বন্ধুত্ব, মোবাইল গেমেই আসক্তি

নজরুল ইসলাম লিখন, রূপগঞ্জ:
“তিন দিন তোর বাড়িত গেলাম, দেখা পাইলাম না, আইতে-যাইতে বার আনা উশোল হইল না, বন্ধু তিন দিন তোর বাড়িত গেলাম”—একসময় এমন গান কিংবা বন্ধুর জন্য লেখা চিঠির আবেগ মানুষের হৃদয়ে গভীরভাবে নাড়া দিত। “ও বন্ধু, শুনতে কি পাও এ গান আমার”—অথবা “বিদেশ গিয়ে বন্ধু আমায় ভুল না, চিঠি দিও, পত্র দিও, জানাইও ঠিকানা”—এমন আকুতিও ছিল বন্ধুত্বেরই এক অনন্য প্রকাশ।

এখন আর আগের মতো বন্ধুর জন্য এমন আকুতি খুব একটা দেখা যায় না। ডাকপিয়নের অপেক্ষায় বাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে থাকার দিনও যেন হারিয়ে গেছে। আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় বদলে গেছে বন্ধুত্বের ধরন। যোগাযোগ সহজ হলেও অনেক ক্ষেত্রে কমেছে মুখোমুখি হৃদ্যতা। মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধুত্বের ধরনকে দিয়েছে নতুন মাত্রা।

ষাটোর্ধ্ব আবুল হোসেন বলেন, “একটা কথা আছে—‘বুক আর মুখ বলে একসাথে, সে হলো বন্ধু, বন্ধু আমার।’ বন্ধুর জন্য জীবন বাজি রাখতাম। কোনো বন্ধুর অসুখ হলে সবাই মিলে দেখতে যেতাম। বন্ধুর সুখে-দুঃখে খোঁজখবর রাখতাম। আর এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি স্ট্যাটাস দিয়েই যেন বন্ধুর দায়িত্ব শেষ। দশজন বন্ধু একসঙ্গে বসলেও আগের মতো কথা হয় না, সবার চোখ থাকে মোবাইল ফোনে। আমরা একসঙ্গে বসে কত হাসি-ঠাট্টা, সুখ-দুঃখের গল্প করতাম। সবকিছুই যেন মোবাইল কেড়ে নিয়েছে। বন্ধুত্বের আড্ডা এখন শুধুই স্মৃতি।”

সারাদিন যে যার কাজে ব্যস্ত থাকার পর বিকেলে খেলার মাঠে, স্কুলের বারান্দায়, গাছের ছায়ায় কিংবা চা-কফির দোকানে তরুণদের ভিড় বাড়তে থাকে। কারও হাতে চায়ের কাপ, আবার কারও চোখ মোবাইল ফোনের রঙিন পর্দায়। তবে নব্বইয়ের দশকের দৃশ্যপট ছিল ভিন্ন।

বিকেল নামলেই গলির মোড়ে কিংবা খেলার মাঠে শোনা যেত বাইসাইকেলের পরিচিত ঘণ্টির শব্দ। কখনো আবার ব্যাকুল হয়ে ডাকপিয়নের পথ চেয়ে বসে থাকত কেউ। তখন বন্ধুত্বে এতটা কৃত্রিমতা ছিল না। কোনো ভুল বোঝাবুঝি হলে ‘ব্লক’ বা ‘আনফলো’ করার সুযোগ ছিল না। মন-কষাকষি মেটাতে মুখোমুখি দাঁড়াতেই হতো। সেই অপ্রতুলতার যুগে ধৈর্য, বিশ্বাস ও পারস্পরিক যোগাযোগের মধ্য দিয়েই গড়ে উঠত জীবনভর টিকে থাকার বন্ধন।

প্রযুক্তির অসীম ছোঁয়ায় সেই ছবিটা এখন আমূল বদলে গেছে। আড্ডার জায়গা দখল করে নিয়েছে মেসেজিং অ্যাপ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। ভার্চুয়াল যোগাযোগ বেড়েছে, কিন্তু অনেকের ক্ষেত্রে কমেছে সরাসরি মেলামেশা।

আজকের তরুণ প্রজন্মের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রোফাইলে বন্ধুর সংখ্যা শত কিংবা হাজার ছাড়িয়ে যায়। কিন্তু সেই দীর্ঘ তালিকার আড়ালে অনেক সময় দেখা যায় একাকিত্ব। শারীরিক বা মানসিক সংকটের সময়ে পাশে থাকার মতো একজন অকৃত্রিম মানুষ না পাওয়ার অভিজ্ঞতাও অনেকের রয়েছে। বিশ্বজুড়ে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও একাকিত্ব নিয়ে স্বাস্থ্য ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক বিচ্ছিন্নতা শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কাজের চাপ ও পারিবারিক ব্যস্ততা বাড়ে—এটাই স্বাভাবিক। এমন পরিস্থিতিতে মন খুলে কথা বলার মতো একজন বন্ধু অনেকটা স্বস্তি দিতে পারেন। তবে ২০২৬ সালে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অতিরিক্ত ডিজিটাল নির্ভরতার কারণে মানুষের সামাজিক যোগাযোগের ধরন আরও পরিবর্তিত হয়েছে।

তবে সময়ের এই পরিবর্তনের সবটুকুই নেতিবাচক নয়। প্রযুক্তির কল্যাণে নব্বইয়ের দশকের মতো ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে চিরতরে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা কমেছে। দেশের বাইরে কিংবা দূরবর্তী স্থানে থাকা বন্ধুর সঙ্গে এখন ভিডিও কলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলা যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে হারিয়ে যাওয়া বন্ধুকেও খুঁজে পাওয়া সম্ভব।

তাই শত শত ফলোয়ারের ভিড়ে হারিয়ে না গিয়ে বহুদিন কথা না হওয়া পুরোনো বন্ধুকে হঠাৎ ফোন করে শুধু জিজ্ঞেস করা যেতে পারে—“বন্ধু, কেমন আছিস?”

রূপগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক সার্জন ডা. অরূপ রতন নাহা বলেন, “অতিরিক্ত মোবাইল ফোন ব্যবহার শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। তারপরও প্রয়োজনের কারণে এর ব্যবহার করতে হয়। আগে মানুষে মানুষে বন্ধুত্ব তৈরি হতো, এখন অনেক সময় মোবাইল ফোনই মানুষের একাকিত্বের সঙ্গী হয়ে উঠেছে।”

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফূল ইসলাম জয় বলেন, “যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে প্রযুক্তির প্রয়োজন এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। তবে এর অপব্যবহারও করা যাবে না। প্রযুক্তি বন্ধুত্বের ধরনে পরিবর্তন এনেছে ঠিকই, আবার হাজার হাজার মাইল দূরের মানুষের মধ্যেও বন্ধুত্ব তৈরি হচ্ছে এই প্রযুক্তির মাধ্যমেই। মোবাইল ফোনের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি আমাদের একাকিত্ব তৈরি করতে পারে। শিশুদের মোবাইল ব্যবহারে অভিভাবকদের সচেতন থাকতে হবে। সময় পেলেই বন্ধুদের খোঁজখবর নিতে হবে। অবসর সময়ে প্রাণ খুলে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে হবে, খেলাধুলা করতে হবে। প্রযুক্তিতে অতিরিক্ত মগ্ন থাকলে একাকিত্ব জীবনকে গ্রাস করতে পারে।”

প্রযুক্তি বন্ধুত্বকে শেষ করে দেয়নি; বরং বন্ধুত্বের ভাষা ও ধরন বদলে দিয়েছে। এখন প্রয়োজন ভার্চুয়াল যোগাযোগের পাশাপাশি বাস্তব জীবনের সম্পর্কগুলোতেও সময় দেওয়া। কারণ, শত শত অনলাইন বন্ধুর চেয়েও বিপদের দিনে পাশে থাকা একজন সত্যিকারের বন্ধুই হয়ে উঠতে পারেন জীবনের সবচেয়ে বড় আশ্রয়।

আপনার সামাজিক মিডিয়া এই পোস্ট শেয়ার করুন

© All rights reserved © 2026 shomoyerkhobor.com
Design & Developed BY starwebhostit